লিওনেল মেসিকে রাগানো প্রতিপক্ষের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সেটি ফুটবল বিশ্ব একাধিকবার দেখেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে লুই ফন গালের মন্তব্যের পর যেমন মেসি দুর্দান্ত জবাব দিয়েছিলেন, তেমনি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও জুড বেলিংহামের সঙ্গে উত্তপ্ত মুহূর্তের পর আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলতে নেতৃত্ব দেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আর সেই কারণেই আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি হুয়ান রোমান রিকুয়েলমের বিখ্যাত মন্তব্য—”মেসিকে কখনও রাগানো যাবে না।”
২০২২ বিশ্বকাপে ফন গালের মন্তব্যের জবাব দেন মেসি
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ডাচ কোচ লুই ফন গাল মন্তব্য করেছিলেন, বল পায়ে না থাকলে লিওনেল মেসির অবদান খুব বেশি থাকে না। তিনি ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, ওই ম্যাচে মেসি কার্যত অদৃশ্য ছিলেন। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস আগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত বলেও জানান।
তবে মাঠের খেলাতেই সেই সব মন্তব্যের জবাব দেন মেসি। অসাধারণ পারফরম্যান্স, একটি গোল ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে টাইব্রেকারে জিতিয়ে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
রিকুয়েলমের বিখ্যাত মন্তব্য
ওই ঘটনার পর আর্জেন্টিনার সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি মিডফিল্ডার হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,
“ম্যাচের আগে ফন গাল মেসিকে নিয়ে যা বলেছেন, সেটা করা উচিত হয়নি। মেসিকে কখনও রাগানো যাবে না। বরং তাকে জড়িয়ে ধরা বা চুমু খাওয়াই ভালো, যাতে সে আপনাকে হারানোর কথা না ভাবে।”
তিনি আরও বলেন,
“বিশ্বের সেরা ফুটবলার যখন রেগে যায়, তখন তাকে হারানো প্রায় অসম্ভব। ফন গালের মন্তব্য আসলে আর্জেন্টিনারই উপকার করেছিল।”
২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও একই দৃশ্য
ফুটবলপ্রেমীদের মতে, রিকুয়েলমের সেই সতর্কবার্তা যেন আবারও বাস্তবে রূপ নেয় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে।
দুই দলের দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাস এবং অতীতের নানা ঘটনার কারণে ম্যাচটি শুরু থেকেই ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। প্রথম তিন মিনিটেই কঠিন ট্যাকলকে কেন্দ্র করে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ম্যাচজুড়েই শারীরিক লড়াই, বাকবিতণ্ডা এবং উত্তেজনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
টাচলাইনে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ও ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলকেও বেশ আবেগপ্রবণ দেখা যায়।
বেলিংহাম ও মেসির উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ইংল্যান্ড একটি কর্নার পেতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই রেফারি হাফটাইমের বাঁশি বাজিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম।
এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে হওয়া একটি ফাউলের দাবি করেছিলেন, যা রেফারি প্রত্যাখ্যান করেন। একাধিক সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট বেলিংহাম বিরতির সময় সরাসরি রেফারির কাছে প্রতিবাদ জানান।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন লিওনেল মেসিও। এরপর বেলিংহাম ও মেসির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে সতীর্থরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫তম মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। তবে এরপরই বদলে যেতে থাকে ম্যাচের গতি।
মেসির অসাধারণ নেতৃত্ব, নিখুঁত পাসিং এবং দুটি অ্যাসিস্টের সৌজন্যে আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয়। এই জয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচজুড়ে মেসির নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করে কেন তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়।
রিকুয়েলমের কথাই কি আবার সত্যি হলো?
২০২২ সালে ফন গালের মন্তব্যের পর যেমন মেসি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছিলেন, তেমনি ২০২৬ বিশ্বকাপেও উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর তিনি নিজের সেরাটা উপহার দেন।
ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, প্রতিপক্ষের উসকানি মেসিকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। আর সেই কারণেই রিকুয়েলমের সেই বিখ্যাত মন্তব্য আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে—
“মেসিকে কখনও রাগানো যাবে না।”
ম্যাচ শেষে হয়তো জুড বেলিংহামও একবার ভেবেছেন—রিকুয়েলমের কথাটি যদি আগে মনে রাখতেন, তাহলে হয়তো ম্যাচের গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত।
